নিজস্ব প্রতিবেদক, উত্তরা |
রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি বিআরটিএ (BRTA) কার্যালয় এখন দালাল চক্রের নিরাপদ দুর্গে পরিণত হয়েছে। বিআরটিএ কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে এখানে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরাসরি সেবা নিতে আসা সাধারণ গ্রাহকদের পদে পদে হয়রানি করা হলেও, নির্দিষ্ট অংকের ঘুষের বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টাতেই মিলছে সমাধান। সম্প্রতি এই অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দালাল চক্রের হামলার শিকার হয়েছেন তিন গণমাধ্যমকর্মী।
টেবিল হয়রানি ও ঘুষের মহোৎসব
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো গাড়ির মালিক সরাসরি কর্মকর্তার কাছে গিয়ে কাগজপত্রের ভুল সংশোধন বা অন্য কোনো সেবা নিতে চাইলে তাকে সুকৌশলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দিনের পর দিন ঘুরেও কাজ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে গ্রাহকদের দ্বারস্থ হতে হয় দালালদের।
এমনই এক ভুক্তভোগী বগুড়া থেকে আসা সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, তিন দিন চেষ্টা করেও গাড়ির কাগজ সংশোধন করতে পারেননি তিনি। অবশেষে দালালের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে তার দীর্ঘদিনের আটকে থাকা কাজ সম্পন্ন হয়।
গত ৫ মার্চ (বৃহস্পতিবার) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দিয়াবাড়ি বিআরটিএ কার্যালয়ে অনুসন্ধানে যান কয়েকজন সাংবাদিক। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে শাহীন নামে এক যুবককে গ্রাহকের কাছ থেকে ঘুষের টাকা ও কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি পরিদর্শক মোঃ মিলনের রুমে ঢুকতে দেখা যায়।
বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়লে অভিযুক্তরা প্রথমে সাংবাদিকদের সাথে বিষয়টি 'রফা-দফা' করার চেষ্টা করেন। এতে ব্যর্থ হয়ে এডি (AD) রুমেও একই চেষ্টা চালানো হয়। সেখানেও সাংবাদিকরা আপস না করায় এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে এডি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
পরবর্তীতে কার্যালয়ের সামনে টাকা লেনদেনকারী শাহীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় দালাল চক্রের প্রধান টিটু ও তার ১৫-২০ জন সহযোগী সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় ভিডিও ধারণকৃত মোবাইল ফোন এবং নগদ ১৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
ঘটনার পর জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা হলেও পুলিশ পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা তুরাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তুরাগ থানার পরিদর্শক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, সাংবাদিকদের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিআরটিএ সংলগ্ন সরকারি জমি দখল করে দালালরা নামমাত্র দোকান ঘর বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
যখনই কোনো প্রশাসনিক অভিযান আসে, তারা তৎক্ষণাৎ সাধারণ ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ ধারণ করে। গত ৯০ দিন আগে সিটি কর্পোরেশন এসব অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলেও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের ‘অদৃশ্য ইশারায়’ আবারও সেগুলো সচল হয়েছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহক ও সচেতন মহলের দাবি, সরকারি এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিকে দালালমুক্ত করতে হলে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।